জাতীয়

গম আমদানি নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ৮ মার্চ, ২০২২

রাশিয়া থেকে যেসব নিত্যপণ্য আমদানি হয় তার মধ্যে গম অন্যতম। এই গম দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য না হলেও রুটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে এ শস্যটির চাহিদা ব্যাপক। এছাড়া বেকারি শিল্পের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় গমের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম গম আমদানিকারক দেশ বাংলাদেশ। গত বছর গমের চাহিদা ছিল ৫৪ লাখ টন। এই বিপুল চাহিদার চার-পঞ্চমাংশই পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। কারণ দেশে গমের বার্ষিক উৎপাদন ১০-১১ লাখ টনের মধ্যে আটকে রয়েছে। এ অবস্থায় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে চাহিদানুযায়ী গম আমদানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে সরকার। 

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভোক্তাদের ওপর সরাসরি যে প্রভাব পড়ে, গমের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ে তারচেয়ে বেশি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৪ বছরের সর্বোচ্চ দামে বৈশ্বিক গমের বাজার। এর জেরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে বেড়ে গেছে ময়দা এবং নিত্যদিনের খাদ্যপণ্য, বিশেষ করে ময়দার তৈরি বেকারি আইটেমগুলোর দাম।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পরপরই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কায় দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গত দশ দিনে প্রতি মণে (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে গমের দাম। তার জেরে বেড়ে গেছে আটা-ময়দা ও সুজির দাম।

এখন দুই কেজি আটার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯০ টাকা থেকে কয়েক বার বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। স্লাইসড রুটির প্যাকেটের দাম ইতোমধ্যেই কিছু ব্র্যান্ডেড বেকারির আউটলেট ও খুচরা দোকানে অন্তত ১০ টাকা বেড়েছে। রাস্তার পাশের চা-স্টলে বিক্রি হওয়া পাউরুটি ও বিস্কুটের দাম বাড়লে কর্মজীবী মানুষের খাবারের পেছনে খরচও বাড়বে।

এদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফ্রেইট খরচ আরো বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে গমের আমদানি মূল্যও। এ দুই খরচ সমন্বয় করতে ভোগ্যপণ্য কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম আরো বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

বাংলাদেশের আমদানি করা মোট গমের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে যুদ্ধরত বৈশ্বিক রুটির বাস্কেট রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। ভারত থেকে গম আমদানি বাড়লেও এই প্রধান দুটি উৎসের অভাব পূরণ করা এক প্রকার অসম্ভবই।

তাই সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সেই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে গমের মূল্যের ওপর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি বুশেলে (২৭ দশমিক ২১ কেজি) খাদ্যশস্যটির দাম বেড়েছে ১২ ডলার, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বার্ষিক গমের চাহিদা ৫৮ লাখ টন। এর ৬০ শতাংশ মেটানো হয় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আমদানির মাধ্যমে। চলতি বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত গম আমদানি করা হয়েছে ৩৭ টনের বেশি। গত দুই মাসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন গম আমদানি করা হয়েছে। গত বছর দেশ দুটি থেকে গম আমদানি হয়েছিল ৩৫ লাখ টন। চাহিদা অনুসাড়ে চলতি বছরের জন্য আরো ৩০ লাখ টন গম আমদানি করতে বলে জানা গেছে মন্ত্রণালয় সূত্রে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকতারা জানান, চলমান যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের প্রধান বন্দরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সরবরাহ ও শিপিং লিঙ্ক। যার ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে শিপমেন্ট। এছাড়া রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার এবং ফ্রেইট খরচ বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যও বন্ধের উপক্রম। এই পরিস্থিতে বাংলাদেশি খাদ্যশস্য আমদানিকারকরা জন্য বিকল্প সোর্সিং দেশের সন্ধান করছে। আর বিকল্প সোর্সিং ব্যবস্থা না পেলে দেশে গমের বাজারে অস্থির হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

এ বিষয়ে টিকে গ্রুপের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মার্কেটিং) বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে ইউক্রেন-রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ। বিকল্প হিসেবে কানাডা এবং আর্জেন্টিনা থেকে গম বুকিং করছি। আর্জেন্টিনার গম গুণগত মানে রাশিয়া-ইউক্রেনের চেয়ে খারাপ হলেও দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি দিয়ে বুকিং দিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে টনপ্রতি গমের দাম ছিল ৩৯০ ডলারের নিচে। এখন এই প্রতি টন গম বুকিং দিতে হচ্ছে ৪৪৬ ডলারে। মেঘনা গ্রুপের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, ভারত থেকে যে গম ফ্রেইট খরচসহ প্রতি টন ৩২০ ডলার পড়ত, সেটাই এখন এলসি করলে পড়ছে ৪০০ ডলার। তবে এই দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। এটা সমন্বয় করতে হলে দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাসলিম বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া মিলে বৈশ্বিক গমের সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করতো। যা এখন একেবারেই বন্ধ। বাকি আছে আমেরিকা, কানাডা, ভারতের মতো কয়েকটি দেশ। ফলে ওসব দেশের বাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে গেছে।

অন্যদিকে চীন ইউক্রেন থেকে কর্ন আমদানি করত তাদের ফিড শিল্পের জন্য। কিন্তু এখন এটা পুরোপুরি বন্ধ। তাই চীন এখন চাচ্ছে ফিডে গমের ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে। এজন্য দেশটি বেশি করে গম কিনে মজুত করছে। এ কারণেও বেড়ে যাচ্ছে খাদ্যশস্যটির দাম।

মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে ইউক্রেনের গম ও ভুট্টা। এই সরবরাহ ব্যাহত হলে গমের অন্যান্য সম্ভাব্য উৎসের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে দাম আরো বাড়বে।

বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার রেদোয়ানুর রহমান বলেন, সবাই অন্য দেশ থেকে আমদানি করে রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু সবাই তো তা পাবে না। কারণ রাশিয়া ও ইউক্রেনের যে গম সেটা তো বন্ধ। কিন্তু চাহিদা তো কমেনি। টাকা হয়তো সবারই থাকবে, কিন্তু গম সবাই পাবে না। দাম অনেক বেড়ে গেলে অনেকেই সেটার আমদানি কমিয়ে দেবে।

তিনি আরো বলেন— এই সংকট যদি দীর্ঘমেয়াদে থাকে, সেক্ষেত্রে যারা রুটির ওপর নির্ভর করত তারা আবার চালে ফিরে যেতে পারে। এজন্য আমাদের চালের উৎপাদনও স্থিতিশীল রাখতে হবে।

সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বেড়ে গেছে। ফলে দেশের বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের সংকট তৈরি হয়ে বুকিং আরো বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। কারণ বিকল্প দেশগুলোতে চাইলেও হঠাৎ করে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব নয়।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, শুধু গম নয়, তেল ও চিনির দামও বাড়তি। একটা বিস্কুট বানাতে গেলে তিনটি উপাদানই দরকার পড়ে। এসব উপাদানে মোট ৮০ ভাগ খরচ হয় এবং বাকি ২০ শতাংশ হলো শ্রমিক থেকে শুরু করে অন্যন্য খরচ। অর্থাৎ এসব উপাদানের দাম বাড়লে ওই উপাদানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

কামরুজ্জামান আরো বলেন, সব মিলিয়ে এখনকার দাম দিয়ে হিসেব করলে তিনটি উপাদান মিলে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ খরচ বেড়েছে। এক্ষেত্রে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।

এদিকে ৫ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ বছর সরকার ৪ লাখ টন গম আমদানি করেছে।  বাকি ১ লাখের সোর্সিং নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংটের সময় সবাই খাদ্য মজুত করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেক দেশই এ কাজ করছে। ফলে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আরো ২ লাখ টন গম আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছি। এর মধ্যে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন আমদানি চূড়ান্ত করেছি। তবে বাকিটার উৎস এখনো জানা যায়নি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোসাম্মাৎ নাজমনারা খানম বলেন, আমরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে তুলনামূলক কম দামে গম পাই। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুটির বাস্কেট থেকে যেহেতু চালান বন্ধ হয়ে গেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়বে। সংকট মেটাতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে ভারত আমাদের জন্য নতুন বাজার। আমরা ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে কথা বলেছি। বুলগেরিয়ার সঙ্গেও আমাদের একটি চুক্তি আছে। সেখান থেকে তুলনামূলক কম দামে গম পাওয়া যাবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads