'অ বউ ধান ভানে রে ঢেঁকিতে পার দিয়া, বউ নাচে ঢেঁকি নাচে হেলিয়া দুলিয়া, বউ ধান ভানে রে' গ্রাম বাংলার সেই কাঠের ঢেঁকি আর ঢেঁকির তালে সেই গান আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার উৎকর্ষতার কারণে গ্রামের নব-বধূরা ঢেঁকি সম্পর্কে কিছুই যেন জানে না। যান্ত্রিকতার নির্মম অগ্রাসনে সেই ঢেঁকি এখন আর চোখে যেন পড়েই না। আবহমান গ্রাম বাংলার প্রতিটি গ্রামের বাড়িতে এক সময় দু-একটি করে ঢেঁকি ছিল।
সারা দিন কাজ শেষে বাড়ীর নারীরা রাতের খাবার শেষ করে ব্যস্ত সময় পার করতো ঢেঁকির সঙ্গে। রাতে তারা ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল বের করত। যা পরবর্তী দিনগুলোর খাবার যোগানো হতো। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই গ্রামে-গ্রামে শোনা যেত ঢেঁকির বাহারী শব্দ ও নানা ধরনের গুন-গুনে নারীদের কাছে গান। শারীরিক দৈনন্দিন পরিশ্রমে সেই সময়ে নারীরা থাকতেন নিরোগ ও স্বাস্থ্যবান।
কিন্তু আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতার ছোবলে সেই ঢেঁকি আর তেমন চোখে পড়ে না। গ্রামের সকল পাড়াতেই এক সময় ঢেঁকি দিয়ে চাল তৈরি, চিড়া ভাঙ্গা, আটা, পায়েসের চালের গুঁড়া, ক্ষির তৈরির চাল, কুমড়ো এবং কালাই দিয়ে সুস্বাদু সেই ডালের বড়ি। বর্তমান যুগে ইঞ্জিনচালিত মেশিনের কাছে আজ গ্রামের সেই ঢেঁকি এক প্রকার হারিয়ে গিয়েছে।
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার কয়ড়া গ্রামের আম্বিয়া বেগম (৭০) জানান, ঢেঁকির কথা আর কি কয়মু বাপজান, আমগর যহন বিয়া অয় তহন বাড়ীর বয়েরা মিলা হন্ধ্য হইলে স্বামী ও পোলাপানদের খাওয়াইয়া ও নিজেরা খাইয়া ঢেঁকি পারে যাইতাম। চাল গুঁড়া কইরা নানা রহমের পিঠা-টিঠা বানাইতাম। আর অন্যের বাড়ী গিয়া পিঠা-টিঠা বানাইয়া দিয়া মেলা আমুদ কইরা হগলে মিলা খাইতাম। এহন আর হেই দিন নাইরে বাপজান। সব যেন খোয়াব।
নব-বিবাহিত আল্পনা (২৫) জানান, আমরা ছোট সময় দেখতাম পৌষ-মাঘে তীব্র শীতে আমাদের মা-চাচীরা বিভিন্ন ধরনের গানের তালে-তালে ঢেঁকিতে চালের গুঁড়া করে নানা ধরনের পিঠা বানাতো। আমরাও নানা কাজে আনন্দে সবার সাথে মেতে উঠতাম।
তিনি বলেন, ঢেঁকির গুণ সম্পর্কে একটা প্রবাদ বাক্য আছে- “ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” এ প্রবাদ বাক্যটিও এখন আর শোনা যায় না।
ঢেঁকিশিল্প গ্রাম বাংলার প্রচীন গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ৭০ দশকের সর্ব প্রথম দেশে রাইস মিল বা মেশিন দিয়ে ধান থেকে চাল বের করা শুরু হয়। তখন থেকেই ঢেঁকির চাহিদা দিনে-দিনে কমতে থাকে। এ সময় দেশেতে পার্বণ পালিত হতো। এ সময় গ্রাম-গঞ্জের কৃষাণ-কৃষাণীরা ও নবান্ন উৎসব, হেমন্ত উৎসব, পৌষ উৎসব, বিয়ের উৎসব থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবে পিঠা তৈরীর ধুম পড়ে যেত।
আধুনিকতার যান্ত্রিক কারণে গ্রাম-গঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-গঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি ও তার ছন্দময় শব্দ ও মহিলাদের গান।





