জাতীয়

ঝুলে রইল হাফ-ভাড়া, বাস মালিকদের ১১ মত 

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৮ নভেম্বর, ২০২১

কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে বাসে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার বিষয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে বিআরটিএ-র বৈঠক। গতকাল শনিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের-বিআরটিএ কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা বৈঠকে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহসহ বিআরটিএ এবং বাস মালিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান জানান, ছাত্রদের বিষয়টি নিয়ে তারা আন্তরিক। খুঁটিনাটি আলোচনা হয়েছে। মালিকদের পক্ষ থেকে বেশকিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, কত ছাত্র পড়াশোনা করে কতজন কার্ড পাবে তার তালিকা দিতে হবে। এই সেক্টরে কত ক্ষতিপূরণ দেবে তা নিয়ে আরো আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, তাদের ক্ষতির জন্য কত ভর্তুকি দেওয়া হবে এসব সিদ্ধান্তের জন্য সরকার ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব এসেছে। এ বিষয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আবার বৈঠক হবে। আমরা আবারো বৈঠক করব। যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় তার জন্য চেষ্টা করা হবে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ঢাকার শতকরা ৮০ শতাংশের মতো বাস মালিক গরিব। তারা যদি হাফ ভাড়া নেয় সরকার কীভাবে তাদের এ ক্ষতি পোষাবে আগে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত আন্তরিকও। কিন্তু আগে অনেকগুলো বিষয়ে সমাধান করতে হবে। আমাদের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সমাধানের মাধ্যমে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। নতুন যে যেসব প্রস্তাব এসেছে এগুলো নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কারা শিক্ষার্থী আর কারা শিক্ষার্থী নয় এ বিষয়েও জটিলতা রয়েছে জানিয়ে এনায়েত উল্লাহ বলেন, বাসে উঠে সবাই বলবে আমরা ছাত্র। অনেকে এ সুবিধা নেওয়ার জন্য নতুন করে আইডি কার্ড বানিয়ে নেবে। সরকার এটার সমাধান কীভাবে করবে সেটাও দেখতে হবে। সবগুলো বিষয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ সময় মহাসচিব প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে তিনি পরিবহন ভাঙচুর, শ্রমিকদের মারধরসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান।

শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভের মুখে গত বৃহস্পতিবার এই ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সাথে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বৈঠক হয়। তবে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া কার্যকর করা হবে কিনা সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।

বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পরিবহন নেতারা ১১টি মত দেন। এগুলো হলো-১. সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি পরিচালিত বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ-ভাড়া নেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে, তা জানা থাকলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের জন্য ভালো হবে। তা না হলে ‘বিআরটিসি বাসে হাফ-ভাড়া, অন্য বাসগুলোতে কেন নয়’ বলে উত্তেজনা আরো বাড়বে।

২. হাফ-ভাড়া শিক্ষার্থীরা দেবে। বাকি টাকা পূরণ করা হবে কীভাবে এবং কোন তহবিল থেকে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

৩. সারা দেশে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার জন্য বাস ব্যবহার করেন কতজন, হাফ-ভাড়া নিলে ভর্তুকি কত টাকা দিতে হবে, সেটি আমলে নিতে হবে।

৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কীভাবে কনসেশন (ছাড়) দেয়, তা জানতে হবে।

৫. শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন কার্ড চালু করা দরকার, যা প্রতিষ্ঠান দেবে। তাহলে শিক্ষার্থী কোন প্রতিষ্ঠানের সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

৬. এ বছর শিক্ষা বাজেট ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলে মোট বাজেট দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। প্রতি বছর শিক্ষা বাজেট থেকে বেশ কিছু টাকা ফেরত যায়। এ টাকাটা পরিবহন ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।

৭. যেসব পরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ-ভাড়া কার্যকর হবে, সেসব পরিবহনে কিছু বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৮. দেশে সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী। তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। একটি যুক্তিসংগত নিয়ম কার্যকর হলে সেটি শিক্ষার্থী ও পরিবহন শ্রমিক উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

৯. বড় শহরের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামেই নগর পরিবহন আছে। বাকি সারা দেশে সাধারণত স্বল্প দূরত্বে শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে।

১০. সরকার, পরিবহন মালিক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিয়ে বিভিন্ন স্তরে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। তাহলে যেকোনো উত্তেজনা সহজেই প্রশমন করা সম্ভব হবে।

১১. সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন কম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশি। উভয় ক্ষেত্রে যারা গণপরিবহন ব্যবহার করেন তাদের জন্য পরিবহন ফি ঠিক করে সেটি দিয়ে কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে বিআরটিসি বাসের ভাড়া ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১ ডিসেম্বর থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে বিআরটিসি প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

ডিজেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানোর পর পরিবহন মালিকদের চাপে সরকার বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ায়। ওই ভাড়া কার্যকরের আগে যেসব বাসে শিক্ষার্থীদের কিছুটা কম ভাড়া নেওয়া হতো সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওইসব বাসে নতুন ভাড়া আদায় শুরু হয়। এর পর থেকেই বাসে অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থীরা। বুধবার সড়কে সিটি করপোরেশনের গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সেই আন্দোলন আরো গতি পায়। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে বেসরকারি বাস মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে বিআরটিএতে বৈঠক হলেও তাতে কোনো ফল আসেনি। এর মধ্যে শুক্রবার বিআরটিসি বাসে অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads