পরিবহন মালিক সমিতির কোনো নির্দেশনা মানছেন না বাস মালিক ও চালকরা। কঠোর নির্দেশের পরও চলছে ওয়েবিল সিস্টেমে। পরিবহন মালিক সমিতি নির্দেশ দিয়েছিল, ১৩ নভেম্বরের পর রাজধানীতে ওয়েবিল সিস্টেমে কোনো গণপরিবহন চালানো যাবে না। এমনকি সিটিং সার্ভিসও চলবে না। কিন্তু এখনো কার্যকর হয়নি সেই সিদ্ধান্ত। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারের বাগবিতণ্ডা চলছেই। আর এখনো সব বাসে লাগানো হয়নি ভাড়ার তালিকা।
রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা গেছে, ডিজেলচালিত বাসের পাশাপাশি সিএনজিচালিত বাসগুলোও ভাড়া বাড়িয়েছে ৪০-৪৫ শতাংশ। কিলোমিটার প্রতি ভাড়া পড়ছে দুই টাকারও বেশি। কোথাও আবার তা সাড়ে তিন থেকে চার টাকা।
রাজধানীর গাবতলী বাস কাউন্টারগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, দূরপাল্লার পরিবহনে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদয় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও দেখার যেন কেউ নেই। যার কাছে যেভাবে পারছে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। দু-একটি কাউন্টারের সামনে নতুন ভাড়ার চার্ট টাঙানো থাকলেও অধিকাংশ কাউন্টারে দেখা যায়নি। বাড়তি ভাড়া আদায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এ নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের মনিটরিং দরকার বলে মনে করছেন যাত্রীরা।
মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনকেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তবে সড়কে মোবাইল কোর্টের অস্তিত্ব তেমন চোখে না পড়ায় ক্ষুব্ধ যাত্রীরা বলছেন, সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারি নতুন কিছু নয়। হুঁশিয়ারি দিয়েই যাচ্ছেন তিনি। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
সরকারিভাবে শহরের অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ। নতুন ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি বাস কর্তৃপক্ষেরই দাবি তাদের গাড়ি গ্যাসে নয়, ডিজেলে চলে। কিছু গাড়িতে আবার গ্যাসের মিটারও খুলে রাখা হয়েছে।
রাস্তায় দেখা গেছে, রজনীগন্ধা, লাব্বায়েক, মৌমিতা, ঠিকানা, লাভলী, সালসাবিল, ট্রান্স সিলভা, বাহন, মনজিল এসব পরিবহনের গাড়ি এখনো চলছে ওয়েবিল সিস্টেমে। কারো কথার বা সিদ্ধান্তের গুরুত্ব নেই এসব পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকদের কাছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, আসলে শুধুমাত্র ডিজেলের দাম বাড়ানোর জন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, তা নয়। ডিজেল বড় একটা কারণ। এছাড়াও গত ৬/৭ বছরে পরিবহনে নানাবিধ ব্যয় বাড়লেও ভাড়া বাড়ানো হয়নি। সড়ক পরিবহন মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সব বিষয় বিশ্লেষণ করেই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে খরচ কিন্তু সিএনজিচালিত গাড়িরও বেড়েছে। তাদের শুধু সিএনজির দাম বাড়েনি, বাকি সব খরচই বেড়েছে।
বিআরটিএর আরেকজন কর্মকর্তা জানান, সিএনজিচালিত গাড়িরও খরচ বেড়েছে। তাদের শুধু সিএনজির দাম বাড়েনি, বাকি সব খরচই বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে সিএনজিচালিত গাড়ির সংখ্যা বড়জোর ১ থেকে ২ শতাংশ হতে পারে। এক্ষেত্রে ডিজেল-সিএনজিচালিত গণপরিবহন প্রভেদের সুযোগ খুব কম।
অপরদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বলছে, সড়কে এখন মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ গাড়ি সিএনজিচালিত। বেশিরভাগ গাড়িই এখন তেলে কনভার্ট হচ্ছে। তবে কত সংখ্যক গাড়ি তেলে আর কতগুলো গ্যাসে চলে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।
রাস্তার এই নৈরাজ্যময় পরিস্থিতি বিআরটিএ মনিটরিং করছে, তবে সংখ্যায় কম হওয়ায়, এর সুফল যাত্রীরা পাচ্ছেন না। এই অভিযান বা মনিটরিং বাস মালিক বা শ্রমিকদের কাছে কোনো গুরুত্বও পাচ্ছে না। বিআরটিএ মনিটরিং করছে দাবি করলেও প্রয়োজনের তুলনায় সে মনিটরিং অনেক কম।
গত ১০ নভেম্বর ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় সিটিং সার্ভিস এবং গেটলক থাকবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্যাহ। তিনি আরো জানিয়েছিলেন, রাজধানীতে চলবে না ওয়েবিল সিস্টেমও।
গত ৪ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়ায় সরকার। পরদিন থেকেই দাম কমানোর দাবি বাদ দিয়ে ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেন গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। সড়ক পথে তিন দিন এবং নৌপথে দুদিন ধর্মঘটের পর সরকারিভাবে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে ৮ নভেম্বর থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি। নৈরাজ্যের শুরু সেদিন থেকেই।
এ প্রসঙ্গে বাস মালিকদের সংগঠন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানিয়েছেন, এখনো যারা গেটলক, ওয়েবিল ও সিটিং সার্ভিস চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





