বীরগঞ্জ পুরাতন জেলখানাটি অযন্ত অবহেলায় এখন যেন ভূতুরে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। এটি পরিত্যক্ত হওয়ার পর প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে চলে বখাটে নেশাখোর ছেলেদের আড্ডা। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে অনেকেই এখন জেলখানাটি ভুতের বাড়ি নামেই চেনে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিগত ৩০ বছর আগে বীরগঞ্জ উপজেলায় ১০০ শত জন কয়েদির ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন মিনি সাব জেলখানা নির্মিত করেন। জানা যায়, ১৯৯১ সালে সরকার উপজেলা আদালত গুলোকে জেলা শহরে স্থানান্তর করে। সারা বাংলাদেশে ২৫ টি উপকারাগার ছিল। উপ-কারাগার গুলোকে প্রত্যাহার করলে, এটি গত ৩০ বছর ধরে পরিত্যাক্ত। উপ-কারাগার এর বর্তমান অবস্থা, অযত্ন, অবহেলা আর তদারকির অভাবে কারাগারটির দরজা-জানালা ভেঙে ভুতুড়ে ঘরে রুপান্তরিত হয়েছে।
ভেতরে ঢুকে ডান পাশেই মহিলা ওয়ার্ড। ওয়ার্ডটি তালা দেওয়া। তাই ভেতরটা দেখা গেল না। এরপর সারি সারি দোচালা ভবন। সশ্রম কারাদ-প্রাপ্ত বন্দীরা এসব ভবনে বসে কাজ করতেন। ডান দিকে ‘আমদানি ওয়ার্ড’ বলে পরিচিত ‘যমুনা সেল’। টিনের ছাউনির একতলা লম্বা ঘর। দরজা বলতে লোহার ফটক। তা দিয়ে যতটুকু আলো-বাতাস আসে। ফলে দিনেও ভেতরটা আবছা আঁধার। কারাগারে আসা বন্দীদের প্রথমে এখানে রাখা হতো।
আমদানি সেলের মুখে বিশাল তিনতলা ভবন ‘মেঘনা’। এটি ছিল সাধারণ বন্দীদের ওয়ার্ড। এর পাশে হাসপাতাল ওয়ার্ড। কারাগারের সবচেয়ে আরামের জায়গা বলে পরিচিত ছিল হাসপাতাল ওয়ার্ড। অভিযোগ আছে, কারা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিলেই এখানে আরামে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যেত। সামনের দিকে তিনতলা ওয়ার্ড ‘হাস্নাহেনা’। বিডিআর বিদ্রোহে জড়িত সদস্যদের এই সেলে রাখা হতো। এর পাশে ফাঁসির আসামিদের সেল। আরও আছে ‘চম্পাকলি’ সেল। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতারা এই সেলে থাকতেন। আরেকটি সেলের নাম ‘নীলনদ’। বিদেশি বন্দীরা এই সেলে থাকতেন। এ রকম চমৎকার নামের আরও সেল আছে। যেমন পদ্মা সেল, মেঘনা সেল, মণিহার, সুরমা, রূপসা, শাপলা, বনফুল, জলসিঁড়ি, বকুল ইত্যাদি।
‘চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই’: কারাগারে দক্ষিণ প্রান্তে আছে চার নেতার ঐতিহাসিক সেল। এর পেছনে কনডেম সেল। ফাঁসির মঞ্চটি কনডেম সেলের কাছে। স্পর্শকাতর হওয়ায় সাধারণ মানুষের এটা দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ঘাতকেরা নির্মমভাবে যে কক্ষে হত্যা করেছিল, সেটি জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে তিনটি কক্ষের প্রথমটিতে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ। পরের দুটিতে ছিলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। সেলের সামনে চার নেতার আবক্ষমূর্তি। তাঁদের ব্যবহার করা কিছু জিনিসপত্র আছে সেখানে। দেয়ালে আছে ঘাতকের ছোড়া গুলির চিহ্ন। এখানে দাঁড়ালে বিষণ্ন হয়ে ওঠে মন।
ফাঁসির আসামিদের সেলের ঠিক সামনেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারা স্মৃতি জাদুঘর। জাদুঘরটির সামনে বঙ্গবন্ধুর একটি আবক্ষমূর্তি। মূর্তিটিকে ঘিরে একটি ম্যুরাল। জাদুঘরে আছে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহার করা জিনিসপত্র। কারাগারে আজ ১ নভেম্বর থেকে যে প্রদর্শনী হবে, সেখানে সাধারণ দর্শক দুটি জাদুঘরই দেখতে পারবেন।
২২৮ বছরের পুরোনো বন্দিশালায় এখন: কারাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭৮৮ সালে। প্রায় ৩৮ একর জায়গার ওপর সুবেদার ইব্রাহিম খাঁ চকবাজারে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এটি জেলখানায় রূপান্তরিত হয়। এখন সেই কারাগারের জায়গায় হবে বিনোদনকেন্দ্র। বন্দিদশা অনুভব করার জন্য ভাড়া দিয়ে থাকাও যাবে কারাগারের ভেতরে। তৈরি হবে শপিং মল, আধুনিক পার্ক, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, ব্যায়ামাগার, কনভেনশন সেন্টার ও জাদুঘর।
গত ২৯ জুলাই এই কারাগার থেকে কারাবন্দীদের স্থানান্তর করা হয় কেরানীগঞ্জে নবনির্মিত কারাগারে। এরপর থেকে বদলে গেছে সবকিছু। ভিড়ভাট্টা নেই। কারাবন্দীর স্বজনদের পদচারণায় মুখরিত হয় না কারাগারের ফটক। আপনজনের জন্য বেদনায় কারও চোখে জলও ঝরে না।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায় , ১৯৮১ সালে সরকারি ভাবে থানা গুলোকে উপজেলায় রূপান্তর করে, সেই সময় প্রতিটি উপজেলা আদালতে বিচার কার্য চালু ছিল। বর্তমান দিনাজপুর জেলা কারাগার ১৮৫৪ সালের উত্তর বঙ্গের বৃহত্তম কারাগার হিসেবে স্থাপিত হয়েছিল।
দিনাজপুরের উত্তরেও বীরগঞ্জ উপ-কারাগার হয়েছে ১৯৮৪ সালে। যার আয়তন ছিল ২.২০ একর জমি। তবে বর্তমানে কমে ১.৮০ একর জমি। তবে ১৯৯১ সাল থেকে বীরগঞ্জ উপ-কারাগার ৩০ বছর থেকে পরিত্যাক্ত।
এখানে মোঃ আব্দুর রহমান, বীরগঞ্জ উপ-কারাগারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে তিনি জানান, কোন ক্ষয় ক্ষতি করতে না দেওয়ায় রাতে আক্রমণ করার চেষ্টা করে অনেকে।
এ বিষয়ে বীরগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকতা সারোয়ার মুশির্দ আহমেদ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারাগারটি ২২ মার্চ ২০০৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে সমাজ সেবা অধিদপ্তরকে হস্তান্তর করেন। রংপুর বিভাগে শিশু অপরাধী সংশোধনী কারাগার না থাকায়, এটিকে রূপান্তরিত করতে পারেন। তিনি আরো বলেন, ঢাকা থেকে আগত একটি টিম পরিদর্শন করেন।





