বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিত্যনতুন রূপে হানা দিচ্ছে করোনাভাইরাস। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটি। আর বাংলাদেশে প্রায়ই রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যুতে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় লকডাউন শিথিলের নামে গণপরিবহনসহ সব কিছু খুলে দেওয়ায় সংক্রমণ আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে করোনা পরিস্থিতি আরো বেড়ে গেলে সামাল দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম। অন্যদিকে, করোনা পরিস্থিতি অবনতি হলে ফের কঠোর বিধিনিষেধ (লকডাউন) দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।
চলতি বছরের শুরু দিকে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয় কঠোর বিধিনিষেধসহ লকডাউন। তারপর ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় এটি। এরমধ্যে কয়েকবার বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিলও করা হয়েছিল। ১৪ জুলাই পর্যন্ত লকডাউন চলার পর কোরবানির ঈদে পশুর হাটে বেচাবিক্রি ও ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আট দিনের জন্য শিথিল করা হয় লকডাউন। কোরবানির ছুটি শেষে ২৩ জুলাই থেকে আবার শুরু হয় কঠোর বিধিনিষেধ, যা শেষ হয় গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে। বুধবার থেকে শতভাগ যাত্রী নিয়ে চলছে ট্রেন, লঞ্চসহ গণপরিবহন। একই সাথে খুলে দেওয়া হয় মার্কেট ও শপিংমল।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, আগামী ১৯ আগস্ট থেকে দেশের সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সকল প্রকার গণপরিবহন চলাচল করতে পারবে। প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়, পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র আসন সংখ্যার ৫০ ভাগ ব্যবহার করে চালু করতে পারবে। একইসাথে সবাইকে মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে অবহেলা পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব বহন করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয় প্রজ্ঞাপনে।
ঘোষিত এই প্রজ্ঞাপন অনুসারে কোরবানির ঈদের কারণে এক সপ্তাহ বিরতি দিয়ে পহেলা জুলাই থেকে শুরু হওয়া কঠোর বিধিনিষেধ আগামী ১৯ তারিখ থেকে সম্পূর্ণভাবে উঠে যাবে। তবে দেশের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে।
সরকারে এই ঘোষণা করোনাভাইরাসের চলমান ঊর্ধ সংক্রমণ ও অধিক মৃত্যু পরিস্থিতির মধ্যে আরো উদ্বেগজনক অবস্থা তৈরি করতে পারে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য, ধীরে ধীরে হলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হার যেভাবে কমছে তা আপাতত ইতিবাচক লক্ষণ।
অন্যদিকে বিধিনিষেধ শিথিল করায় বুধবার থেকে সারা দেশে বাস, ট্রেন, লঞ্চ চলাচলের পাশাপাশি খুলেছে দোকানপাট, শপিংমল, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস।
তবে বাস, লঞ্চ, ট্রেন ও মার্কেটসহ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, সামান্য উপেক্ষা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। দেশে করোনা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেই মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় সবকিছু অবাধের চললে ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। তাই করোনা মহামারি সংক্রমণ রক্ষা পেতে আমাদের সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অজানা সংক্রমণের উৎসটিকে বন্ধ করতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এখনো দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এর মধ্যে বিধিনিষেধ শিথিল করায় আমরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছি। কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। তাই আশঙ্কা করছি যে, মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্যবিধির কোনো তোয়াক্কা না করে চলাফেরা করছে, তাতে সামনের দিনগুলো এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে দেশে করোনা ও ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, করোনা পরিস্থিতি আরো বেড়ে গেলে সামাল দেওয়া যাবে না। মহামারি করোনাভাইরাস যাতে আর না বাড়ে, সেজন্য সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা ডিএনসিসিতে (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন) এক হাজার শয্যার কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল তৈরি করেছি। সমপ্রতি বঙ্গমাতা ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি জিনিসেরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদেরও রয়েছে। এর বাইরে গিয়ে আর হাসাপাতালে শয্যা বাড়ানো সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, করোনা পরিস্থিতি অবনতি হলে ফের কঠোর বিধিনিষেধ (লকডাউন) দেওয়া হবে। পৃথিবীর যে কোনো দেশে করোনা পরিস্থিতি অবনতি হলেই লকডাউন দেওয়া হয়। যেমন অস্ট্রেলিয়াতে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে, কারফিউ দেওয়া হয়েছে। আমেরিকাতে দেওয়া হয়েছে। কারণ এর কোনো বিকল্প নেই।
দেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ একজনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮৬২ জন। একইসাথে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২৩ হাজার ৬১৩। দেশে বর্তমানে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের হার প্রায় ২৪ শতাংশ।





