রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর সায়্যেদ দিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে ৭ হাজার একর জমি জোর বা অন্যায়ভাবে দখলের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কমিশনের তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি প্রাথমিক তদন্তে জমি দখলের তথ্য পান। অনুসন্ধান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
দুদকের সচিব ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার জানান বলেন, হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পীর জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। এরই মধ্যে অনুসন্ধানকারী দল ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৭ হাজার একর জমি দখলের প্রমাণের নথি পায়। এসব জমি জোর করে দখল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাবারবাগানও। কেউ জমি দিতে না চাইলে তার বিরুদ্ধে মামলা ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। অনুসন্ধান শেষে হাইকোর্টে অনুসন্ধানের প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রাজারবাগ দরবার শরীফের সব সম্পদের তথ্য বিবরণী দাখিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। ভুক্তভোগী ৮ ব্যক্তির পক্ষে অ্যাডভোকেট শিশির মনির হাইকোর্টে এ রিট দায়ের করেন। রিটকারীদের মধ্যে শিশু, মহিলা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মাদরাসার শিক্ষক ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকে রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর ও তাদের মুরিদদের হয়রানিমূলক মামলার শিকার। রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যৈষ্ঠ সচিব ও আইজিপিসহ মোট ২০ জনকে বিবাদী করা হয়। এদিকে রিট আবেদনের পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাজারবাগ দরবার শরিফের সব সম্পদের তথ্য খুঁজতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), তাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কি না তা তদন্ত করতে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং উচ্চ আদালতে রিটকারী আট জনের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পরে ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন জানানো হয়। তবে আদালত আবেদনটির শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেন। পরে আদালত তাদের রিট বাতিল করে গত ৫ অক্টোবর রাজারবাগ দরবার শরিফের সব সম্পদের তথ্য, জঙ্গি সম্পৃক্ততা ও হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে তদন্তের নির্দেশনা সংক্রান্ত হাইকোর্টের আদেশের লিখিত অনুলিপি প্রকাশ করে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পদক্ষেপ গ্রহণে আর কোনো বাধা ছিল না।
এদিকে আদালতের নথি পাওয়ার পর গত ৮ নভেম্বর দুদক রাজারবাগ দরবার শরীফের সম্পদ অনুসন্ধানে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধানী টিম গঠন করে। অনুসন্ধানী এ টিম তাদের অনুসন্ধান করতে থাকে। প্রাথমিক অবস্থাতেই সারাদেশে অন্তত ৭ হাজার একর জমি দখলের প্রমান হাতে চলে আসে।
দুদকের সচিব ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেন, রাজারবাগ দরবার শরীফের পীর দিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে ৭ হাজার একর জমি দখলের প্রমান হাতে এসেছে। পাশাপাশি আরো অভিযোগ অনুসন্ধানে রয়েছে। আমরা যে তিন সদস্য বিশিষ্ট অনুসন্ধানী টিম গঠন করেছি তারা তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পুরো তদন্ত শেষেই আমরা আদালতকে অবহিত করবো।
এদিকে দুদক ছাড়া তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি ও ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)
দুদক সূত্র জানায়, রাজারবাগী পীর সায়্যেদ দিল্লুর রহমানের অনুসারীরা আল বায়্যেনাত গ্রুপের নামে বান্দরবানের ঈদগড়, ইয়াংছা, সাঙ্গু ও ফাইস্যাখালী মৌজার প্রায় ৬ হাজার একর পাহাড়ি ভূমি, চাষের জমি, সরকারি খাসজমি ও ভিটা-বাড়ি তাদের দখলে নিয়েছে। পীরের সিন্ডিকেট মুরং, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালিদের ভিটে-মাটিও কেড়ে নিয়েছে। রাজারবাগ পীরের সংগঠন উলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত, মোহাম্মাদীয়া জামিয়া শরীফ, সাইয়্যিদুল আইয়াদ শরীফের নামে এসব দখলবাজি চালিয়েছে।
জানা যায়, তারা প্রথমে আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষকে টার্গেট করে মামলা দেয়। মামলা তুলে নেওয়ার নামে তাদের সহায়-সম্পদ হাতিয়ে নেয় রাজারবাগ পীরের অনুসারীরা। বান্দরবানের লামা উপজেলার গহীন বনাঞ্চল মম্বিরছড়া, আমতলী ও কেয়ামাং ত্রিপুরা পাড়ার ৫৬টি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। তাদের কৌশল সম্পর্কে স্থানীয়রা জানায়, আল বায়্যিনাত গ্রুপের নামে প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার নামে একখণ্ড জমি চায় রাজারবাগ পীরের অনুসারীরা। যার নেতৃত্বে ছিলেন পীরের খাস মুরিদ আনিসুর রহমান ওরফে লাদেন মৌলভি। পরে তারা মম্বিরছড়ার মারমা পাড়ার ৪০টি, কেয়ামাং ও আমতলী পাড়ার ১৬টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে। পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন উপজাতীয় ‘হেডম্যান’ ও বাঙালি ‘কারবারি’দের ‘হাত করে’ সাধারণ মানুষের শত শত একর জমি লিখে নেয়।
সূত্র জানায়, আল বাইয়্যিনাত বা লাদেন গ্রুপের দখলি জমিতে গাছের চারা রোপণ করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে তার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে দুটি ও ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে মানব পাচারের একটি মামলা দেওয়া হয়। পরে লামার ফাইস্যাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদারের মাধ্যমে সমঝোতা করা হয়। এজন্য তাকে ৭ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।
লামা থানার মম্বিরছড়া এলাকার রবার্ট ত্রিপুরার অভিযোগ, রাজারবাগী পীরের অনুসারীরা তাকে মামলায় ফাঁসিয়ে ভিটে-মাটি আর ফসলি জমি সব হাতিয়ে নিয়েছে। এখনো তার ওপর চলছে মামলার খড়গ। একই এলাকার মুক্তারাম ত্রিপুরার জানান, স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর পর তারা পরিদর্শনেও আসে। কিন্তু তারা বেদখল হওয়া ভিটেমাটি ফিরে পাননি।
লামা থানার ফাইস্যাখালী ইউনিয়ন পরিষদের গয়ালমারার সৈয়দ জিন্নাত আলী কুতুব আলীর অভিযোগ, ‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভিটে হারানো উপকূলীয় বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে লামা থানার ২৮৫ নম্বর সাঙ্গু মৌজায় ৩৮৫ একর জমি বন্দোবস্ত দেয় সরকার। ৭৭টি পরিবার ৫ একর করে করে জমি বন্দোবস্ত পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস এবং চাষবাস করে আসছিল। সেই জমির ওপরই নজর পড়ে রাজারবাগ পীরের অনুসারীদের। জাল কাগজ তৈরি করে প্রায় ৩০০ একর জমি ভিটা-বাড়িসহ দখল করে নেয় তারা। সেখানে মোহাম্মদীয়া জামিয়া শরিফ নামে তাদের আস্তানা করা হয়। পীরের পক্ষে দখলে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্থানীয় জাকের হোসেন, মুসলিম উদ্দিন, মুজিবুল হক, লুৎফর রহমান, মোহাম্মদ সেলিম ও নূরুল আলম।’
লামার সাঙ্গু মৌজার মুক্তারাম কারবাবির অভিযোগ, ‘সাঙ্গু মৌজায় রাজারবাগী পীরের একটি আস্তানার জন্য প্রায় এক হাজার একর জমি দখল করা হয়েছে। আমি এলাকার সচেতন নাগরিকদের নিয়ে প্রতিবাদ করায় তারা আমার বিরুদ্ধে ডাকাতি-দস্যুতার তিনটি মামলা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে এসবের প্রতিবাদ করে আসছি। জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন স্থানে স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছি না।’
অভিযোগ আছে, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থানার মধ্য বেতছড়ির আবুল হোসেন লিডার, তার ছেলে নুরুল আলম ও খলিল হাওলাদারের কাছ থেকেও জোর করে ১১ একর জমি হাতিয়ে নিয়েছে রাজারবাগী পীরের অনুসারীরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা ও রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক পাওয়া মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সোহেল চৌধুরীর অভিযোগ, রাজারবাগ পীরের অনুসারী কামাল মিয়া তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের নয়নপুরে তার দুটি বাড়ি দখল করে নিয়েছে।
ঢাকার আশুলিয়া থানার চারাবাগ এলাকার মাহবুবর রহমান খোকনের মেয়ে মুনিয়র অভিযোগ, ‘বাসাইদ মোজায় ৬০ শতাংশ জমি রাজারবাগের পীরের লোকজন দখল করে নিতে চায়। জমি লিখে না দেওয়ায় আমার বাবার নামে বান্দরবানের লামা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কেরানীগঞ্জে পাঁচটি মামলা দিয়েছে। এর মধ্যে লামা থানার মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। একটি মামলায় আমার বাবা এখনো জেলে আছেন।’ মুনিয়া জানান, একইভাবে তার চাচাতো ভাইকেও ৬০ শতাংশ জমি দরবারের নামে লিখে দিতে বলে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর ৮৭০ শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা একরামুল হাসান কাঞ্চনকে ৪৬টি মামলায় ফাঁসিয়ে শান্তিবাগে তার পৈতৃকবাড়ি ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ডাইং ফ্যাক্টরি দখলের চেষ্টা করেছে পীরের সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে অধিকাংশ মামলার বাদী রাজারবাগী পীরের মুরিদ শাকেরুল কবীর।
দুদক বলছে, এসকল অভিযোগের প্রত্যেকটির সত্যতা পাওয়া গেছে। আরো অভিযোগ রয়েছে সেগুলোরও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
এদিকে সিআইডির সূত্র বলছে, হাইকোর্টের কপি তারাও পেয়েছেন। খুব শীঘ্রই কমিটি গঠন করে তদন্ত শুরু করা হবে। সিটিটিসির ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, দ্রুত এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করা হবে।





