শঙ্কা-সম্ভাবনার বইমেলা

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

শঙ্কা-সম্ভাবনার বইমেলা

  • ইমরান হুসাইন, জবি
  • প্রকাশিত ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মাত্র কয়েকদিন পরেই বইপ্রেমীদের পদচারণে মুখরিত হবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ। যারা নিয়মিত বই পড়েন না, তারাও অন্তত একবারের জন্য হলেও আসবেন নতুন কোনো বই এসেছে কি-না সেই খোঁজ নিতে। অনেকে আসবেন ঘুরতে প্রিয় মানুষের সঙ্গে। বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই মেলা শুধু বইয়ের প্রচার কিংবা বিক্রি নয়, বইমেলা বাঙালির প্রাণের উৎসব।

তাই বইমেলাকে ঘিরে প্রকাশকরাও বেশ ব্যস্ত। অন্তত গতবারের তুলনায় এবার বেশি বই প্রকাশের কথা জানিয়েছেন বেশ কিছু প্রকাশক। তবে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের মতো এবারো বইমেলা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে শঙ্কা-সম্ভাবনার হতে চলেছে এবারের বইমেলা।

একাধিক প্রকাশক জানিয়েছেন, সংক্রমণ আরো বাড়লে মেলা হবে কি-না, হলেও জমবে কি-না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সংক্রমণ বাড়া অব্যাহত থাকলে ভয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বইমেলায় অনেকেই আসবেন না। বিশেষ করে এরই মধ্যে মেলা দু-সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়ায় তা আরো বেশি করে ভাবাচ্ছে প্রকাশকদের। আবার আশাও ছাড়ছেন না তারা। ফলে বইমেলা ঘিরে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে শঙ্কা সম্ভাবনা।

পার্ল পাবলিকেশন্সের প্রকাশক হাসান জাহিদি বলেন, করোনার কারণে গতবার আমরা আশানুরূপ ফল পাইনি, সে কারণে এবারের মেলা নিয়ে আমাদের একটু বেশি প্রত্যাশা ছিল। তবে এবারো করোনার থাবা আমাদের প্রত্যাশাকে হতাশার ছায়ায় ঢেকে দিচ্ছে। সরকারের দেওয়া কঠিন বিধিনিষেধ আমাদের আশায় বালি দেওয়ার মতো। বিধিনিষেধে বলেছে যে, মেলায় প্রবেশকারীদের টিকা গ্রহণের সনদ দেখাতে হবে। সনদ ব্যতীত কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু আমরা সবাইতো জানি যে শতভাগ টিকার আওতায় আমরা নেই। এখানেই তো আমাদের ক্রেতা বা পাঠকের একটা অংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে আগেই। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা গেলে এবারের মেলায় করোনা কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারবে না। একদিকে সময় সংক্ষেপণ অন্যদিকে এমন কঠিন বিধিনিষেধ থাকলে আমাদের ব্যবসায় মেঘ ঘনিয়ে আসবে।

এবার বেশি বই প্রকাশের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গতবারের চেয়ে প্রায় সবাই এবার বেশি বই প্রকাশের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে আমাদের প্রকাশনা থেকে এবার কতটি বই আসবে এটা নিশ্চিত  করে বলতে পারছি না কারণ আমরা বড় ধরনের শঙ্কায় আছি। মূলধারার লেখক যারা আছে, দেশব্যাপী যাদের সুনাম, যাদের লেখা পাঠক পড়ে তারাও অনেক চাপে আছে। গতবছর যেসব বড়বড় লেখকগণ বই বের করেছে তাদের অনেক বই পাঠকের কাছে প্রচারণা পায়নি মেলা নিয়ে নানা রকম সংকোচের জন্য। এবারো তারা একই ভয় পাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত আমাদের যতগুলো বই নিশ্চিত হয়েছে তার মধ্যে আলোচিত বই আনিসুল হকের ‘করোনা কালের কৌতুক’। জাফর ইকবালের ‘শিশু সমগ্র’।

এশিয়া পাবলিকেশন প্রধান নির্বাহী আশরাফুল ইসলাম বলেন, বাঙালি এমনেই বই পড়তে চান না। তার ওপর এত শর্ত! জোর করে কাউকে বই পড়ানো যায় বর্তমান সময়ে সেখানে বইমেলায় এত নিয়ম, এত বাধা ভেঙে বই কিনবে মানুষ? স্বাভাবিকভাবেই আমরা এবার ধরে নিয়েছি যে আমরা বইমেলায় লস খাবো কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা বইমেলায় অংশগ্রহণ করছি। বইমেলায় আমার কতটা বই বিক্রি হলো, কত লাভ হলো আমরা তা ভাবছি না। বর্তমান সময়ে প্রতি ক্ষণে ক্ষণেই নতুন সিদ্ধান্ত আসছে। একেক সময় একেক নিয়ম আমরা ধরেই নিয়েছি আমাদের লস হবে কারণ এত বাধা পেরিয়ে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি মেলায় বই কিনতে আসবে। দেশের আর কোনো জায়গায় এত কড়াকড়ি নাই যত বাধা বইমেলায়। সব নিয়ম বইমেলার জন্য প্রযোজ্য।

সাহিত্য বিকাশ প্রকাশনীর পরিচালিক ফজলুর রহমান বলেন, আমরা এবারের বইমেলায় যেতে চাচ্ছি না। যখনকার যে কাজ তখন সে কাজ না করলে সেই কাজে লাভবান হওয়া যায় না। অসময়ে মেলা করে গতবার আমরা এর ফল পেয়েছি। স্টলের জন্য আমরা অনেক আগেই টাকা জমা দিয়েছিলাম কিন্তু আমরা এখন আর যেতে চাচ্ছি না। আমরা অংশগ্রহণ করবো না বলে টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছি। যদি ফেরত দেয় তাহলে তো ভালো। আর যদি না দেয় তবে বাধ্য হয়ে নামমাত্র অংশগ্রহণ করতে হবে।

কথা প্রকাশ প্রকাশনীর জাফিরুল ইসলাম বলেন, মেলা নিয়ে আমাদের আগে প্রস্তুতি ছিল অনেক বেশি। চিন্তা ভাবনাও অনেক বেশি ছিল। কিন্তু করোনার তালগোল ও সরকারি বিধিনিষেধের রোষানলে আমরা বই প্রকাশনার সংখ্যা কমিয়ে এনেছি। বইমেলায় আমাদের বই কম সংখ্যক প্রকাশ পাবে। এর পরিমাণ কত এটা এখন বলা যাচ্ছে না তবে বইমেলা বাদেও আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবো পরে। তবে বই মেকার যে অবস্থা এটার ওপর আমাদের আস্থা নেই এখন।

জ্ঞান বিতরণীর পরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রীষ্মকালের তরমুজ যদি আপনি শীতকালে বাজারে আনেন তাহলে কিন্তু আপনি বাজার পাবেন না। তেমনি বর্তমাল বইমেলার একই অবস্থা। আমি পরিষ্কার দেখতে পারছি বইমেলা খুবই খারাপ অবস্থা হবে। এত ঝামেলার কথা চিন্তা করে আমি এবার যাচ্ছি না।

আগামী প্রকাশনীর ওসমান গণি বলেন, গতবছর প্রকাশকরা বইমেলা থেকে তাদের খরচও উঠাতে পারেননি। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিও জটিল। এমন অবস্থায় মেলা করে খুব একটা লাভ হবে তা ভাবার নেই। মেলা নিয়ে প্রকাশকদের ভাবা উচিত। এই অবস্থায় মেলা না করাই ভালো এবং গতবারের মতো টাকা না উঠার বিষয় আছে। পরপর দুবছর প্রকাশকদের এভাবে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত না। বিশেষ করে মেলা শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন নির্দেশনা যেমন-আজ চারটা পর্যন্ত, আজ তিনটা পর্যন্ত নিয়ম বেঁধে দেওয়া সুখকর নয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতে কলকাতা বইমেলাও একবার বন্ধ ছিল। তাতে খুব বড় ক্ষতি হয়নি- এ বিষয়গুলো আমাদের ভাবা উচিত।

তিনি বলেন, এটা ঠিক যে বইমেলাকে কেন্দ্র করে অনেক নতুন বই আসে, প্রকাশ হয়। তবে যারা প্রকৃত প্রকাশক তারা সারাবছরই বই প্রকাশ করেন। আমার প্রকাশনী থেকেও প্রায় ৪০টি নতুন বই প্রকাশ হয়েছে।

এছাড়া কাজের ঘাটতিতে পড়েছেন বই বাউন্ডিং কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা। কারখানায় কর্মরত শফিকুল আহমেদ বলেন, মেলা হবে কি হবে না এই চিন্তায় আমাদের প্রকাশকনাগুলো। ওয়ার্ডারের ওপর ভিত্তি করে আমাদের কাজ। বইমেলা শুরু হবার তিন মাস আগে থেকে আমারা নাওয়া খাওয়ার সময় পাই না। আর এখন ১০ দিন বইমেলা কিন্তু আমাদের হাতে ওই রকম কাজ নেই। তুলনামূলক কাজের চাপ অনেক কম আমাদের।

উল্লেখ্য, এর আগে আগামী ১ ফের্রুয়ারি থেকে অমর একুশে বইমেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। দুই সপ্তাহ পর কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য বইমেলাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে করোনার টিকা সনদ ও কোভিড টেস্টের সনদ প্রদর্শন করতে হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads