সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আয়বৈষম্য নিরসন জরুরি

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আয়বৈষম্য নিরসন জরুরি

  • প্রকাশিত ২ জুন, ২০২১

ইত্তেখারুল ইসলাম সিফাত

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার ইতিহাসের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনই ছিল বৈষম্যহীন অর্থনীতির ও অসাম্প্রদায়িক আলোকিত মানুষের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ তেইশ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বাঙালি জাতি এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের  মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য অর্জন করেন। আমাদের গৌরবান্বিত সেই সংগ্রামের অন্যতম কারণই ছিল মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন করা। দেশ স্বাধীনের চার যুগ কেটে গেছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাফল্য পরিলক্ষিত হলেও ধনী-গরিব বৈষম্য কি আদৌ কমেছে? ১৯৭২ সালে যেখানে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচজন, সেখানে বাংলাদেশ আজ দ্রুত ধনী বৃদ্ধির তালিকার প্রথম দিকেই অবস্থান করছে। ১৯৭১ সালে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০ ডলার, ২০২১ সালে বাংলাদেশে তা দুই হাজার অতিক্রম করলেও এখনো প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষের আয় ১ ডলারের নিচে। ফলে ধনী-গরিবের বৈষম্য এখানে স্পষ্ট। দ্রুত ধনী বৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বগতি আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরূপ এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। অদূর ভবিষ্যতে এটি আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে ধরে নেওয়া যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন বেড়েছে, একইসাথে দরিদ্রতা হ্রাস পেয়েছে বহুলাংশে। কিন্তু সম্প্রতি ধনী-গরিব বৈষম্য বৃদ্ধির যে চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়, তা আমাদের জন্য সত্যিই উদ্বেগের।

বিশ্বব্যাংক কর্তৃক ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম! একইসাথে নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ-এক্স এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনীর সংখ্যা বৃ্দ্ধিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অবস্থান হবে বিশ্বে তৃতীয়। তাদের মতে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অতি ধনী বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। গরিবকে শোষণ করে ধনীর সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রবণতা পুঁজিবাদী সমাজে নতুন নয়। বহুকাল আগেই কার্ল মার্কস থেকে শুরু করে অনেক রথী-মহারথীও সোচ্চার হয়েছিলেন বৈষম্য নিরসন করার জন্য। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু পুঁজিবাদীদের চাতুরতার কাছে তা হেরে যায়। বৈষম্যের এমন চিত্র সারা পৃথিবীতেই ঘনীভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অক্সফ্যাম ২০১৭ সালের একটি রিপোর্টে বলেছিল, মাত্র আটজন মানুষের কাছে যে সম্পদ আছে, সেই পরিমাণ সম্পদ বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মানুষের সম্পদের সমান! তবে সম্পদ যত বাড়ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বা অর্থনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১৭৭৬ সালে স্কটিশ অর্থনীতিবিদ ও অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ তার ‘দি ওয়েলথ অফ নেশনস’ নামক  যুগান্তকারী বইটিতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ ও ধনীর সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমেও সমাজের সকলেই লাভবান হতে পারে, সেই সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বৃদ্ধির উদ্বেগজনক গবেষণাপত্র প্রকাশের পর ২০১৩ সালে ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফ্যামের সাবেক প্রধান নির্বাহী বারবারা স্টকিং বলেছিলেন, মুষ্টিমেয় কয়েকজনের জন্য সম্পদ সৃষ্টি হলে অবধারিতভাবে তা সমাজে বহু লোকের উপকারে আসবে এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, কারণ বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটাই ঘটছে। বিশ্বব্যাপী এই বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ে বৈষম্যের দিক থেকে সবচাইতে শীর্ষ দেশগুলো বিশেষত, নিম্নআয়ের দেশ হয়েও বাংলাদেশে অতি ধনী বৃদ্ধি ও দ্রুত বৈষম্য বৃদ্ধির কারণও মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া। যেখানে ধনী হওয়া অধিকাংশ কোটিপতিই দুর্নীতি, ঋণখেলাপি, স্বজনপ্রীতি ও বিদেশে অর্থপাচারের মাধ্যমে তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। আর সেজন্য তা দেশের বৃহত্তর জনসাধারণের কল্যাণ বয়ে আনছে না। উপরন্তু মুষ্টিমেয়  লোকের কাছে সম্পদ থাকার ফলে যে প্রকট সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, তা আমরা বাস্তবে অবলোকন করেছি করোনা মহামারীতে। এ সময় বিশাল সংখ্যক মানুষ দরিদ্র থেকে হতদরিদ্রে পরিণত হয়েছে। এসব মানুষের ন্যূনতম খাদ্যের সংস্থানের এদিক-সেদিক ছুটতে হয়েছে। কাজ-কর্ম হারিয়ে আর্থিক দীনতায় পড়া খেটে খাওয়া এই মানুষগুলো মানবেতর দিনাতিপাত করেছেন। আর এই দৃশ্যপটকে ব্যাপক বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবেই চিত্রায়িত করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো সমস্যা সৃষ্টির পেছনে কিছু কারণ থাকে এবং সেই কারণসমূহ চিহ্নিত করার মাধ্যমেই সমাধান বের করা যায়।  বিশেষজ্ঞরা বৈষম্য বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টিকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন— সুশাসনের অভাবকেও বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। বৈষম্যের এ ধারার অতিবৃদ্ধি সমাজে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির দ্বারকেই উন্মুক্ত করে  দিচ্ছে।

বিগত কয়েক দশকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি পরিলক্ষত হলেও বৈষম্যের এই হার বৃদ্ধি সহনীয় মাত্রায় না আনা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রধান অভীষ্ট দরিদ্রতা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। এটি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অধিক পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিতকরণ, বিশেষত স্বাস্থ্যখাত; যে খাতে এই মহামারীকালীন সময়েও নানা অসংগতির চিত্র পরিদৃশ্যমান হয়েছে। এই খাতকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও বিদ্যমান কর ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও বরাদ্দ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে বৈষম্যের মাত্রা কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও প্রান্তিক পর্যায়ে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সমৃদ্ধ জাতি গড়তে হলে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করার প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে, যা সাংবিধানিকভাবেও স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই লক্ষ্যেই সমাজতন্ত্রকেও সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও উন্নত সমৃদ্ধ ওয়েলফেয়ার স্টেটস হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য ধনী-গরিবের মধ্যে সম্পদের ভারসাম্য ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন অতীব জরুরি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads